স্বাধীনতা—শুধু একটি শব্দ নয়; এ আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, স্বপ্ন ও সত্তার মর্মকথা। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, লাখো বীর শহীদের আত্মত্যাগ ও অগণিত মানুষের নিঃস্বার্থ ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা। ২৫শে মার্চের ভয়াল কালরাত্রিতে যে বর্বরতা নেমে এসেছিল, তার প্রতিটি ক্ষতের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা গড়েছি নতুন ভোরের প্রত্যয়। যেসব বীর মুক্তিযোদ্ধা তাঁদের জীবন বাজি রেখে শত্রুর মোকাবিলা করেছেন, তাঁদের অবদানের কারণেই আজ আমরা গেয়ে উঠতে পারি বিজয়ের গান।
এখানে সংকলিত পাঁচটি কবিতায় ফুটে উঠেছে সেই রক্তঝরা ইতিহাস, মুক্তিসংগ্রামের শৌর্য, স্বাধীন দেশ গড়ার প্রত্যয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কবিতাগুলোর প্রতিটি স্তবকে উঠে আসে বাঙালির আত্মমর্যাদার অগ্নিমন্ত্র, ঐক্যবদ্ধতার শক্তি ও আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির আলোকধারা। এই স্বাধীনতা শুধু অতীতের নয়—এ বর্তমান ও ভবিষ্যতের মাইলফলক, যা আগামী দিনের স্বপ্নবুননে নতুন প্রেরণা জোগায়। সবকটি কবিতা লিখেছেন- ময়নুল ইসলাম শাহ্
কবিতা ১: রঞ্জিত রক্ত, অর্জিত ভোর
রক্তে রাঙা প্রভাত দেখেছে মাতৃভূমি,
যেখানে জাগে লাল-সবুজের পতাকার ঝঙ্কার,
ভোরের মিষ্টি আলো ছুঁয়ে যায় মানুষের মুখ,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে বাজে বিজয়ের অহঙ্কার।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম অঙ্কুরিত করে
চেতনার প্রস্ফুটন, স্বপ্নের পথ করে প্রশস্ত,
এক সাগর বেদনার স্রোত বহে যায় শিরায়,
তবু নতুন সূর্যোদয় আহ্বানে আমরা আশ্বস্ত।
নতুন সূর্যোদয়ে জেগে ওঠে নতুন দেশ,
স্বাধীনতার ব্যঞ্জনায় মানুষ পায় প্রত্যয়,
ঘরে ঘরে জয়ের উদ্দীপনা, পূর্ণ হয় স্বপ্ন,
সীমানা ছাড়িয়ে যায় বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয় ।
পৃথিবীর বুকে বাংলার নাম আজ উজ্জ্বল,
লড়াইয়ের ইতিহাসে লেখা হলো অনন্য মহিমা,
সেখানে বীরত্বের গান বাজে নিঃশব্দে,
শাসকগোষ্ঠীর শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির সীমানা।
অর্জিত স্বাধীনতা কেবল একটি ঘটনা নয়,
জীবনধারার প্রাত্যহিকতায় মুক্তির আবেশ
দায়িত্ব এদেশের প্রতিটি সন্তানের কাঁধে,
আগামী দিনে গড়তে হবে সোনার বাংলাদেশ।
ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল স্বাধীনতার স্মৃতি,
সেই প্রেরণায় লিখি জাতির গৌরবগাঁথা,
এক পতাকায় এক হয়ে থাকি আমরা সবাই,
বাংলার গৌরব অক্ষুণ্ণ রেখো, হে বিধাতা।
কবিতা ২: ২৫শে মার্চের কালরাত্রী
(২৫শে মার্চের ভয়াল কালরাত্রি বাঙালির ইতিহাসের এক অন্ধকারতম অধ্যায়, যেখানে শত্রুপক্ষের নির্মম বর্বরতায় কেঁপে উঠেছিল পুরো জাতি। সেই রাতের আর্তচিৎকারই জাগিয়ে তুলেছিল প্রতিরোধের অগ্নিমন্ত্র, রক্তমাখা পথ থেকে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীনতার সুবর্ণ সকাল। এ কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে সেই ভয়াল স্মৃতির বন্ধনে বোনা আগুন-ঝরা সাহস ও মুক্তির অনন্ত প্রত্যয়।)
২৫শে মার্চের ওই ভয়াল রাত,
শ্বাসরুদ্ধকর আঁধারে কেঁপেছিল জনপদ,
বাক্রুদ্ধ বারুদের গন্ধে অন্ধকার ঢেকে যায়,
বাঙালির ঘরে ঘরে আতঙ্কের কালোরাত।
আচমকা মৃত্যু নেমে আসে নিস্তব্ধ শহরে,
আর্তচিৎকারে বাতাস হয়ে ওঠে বিভীষিকা,
ঘুমন্ত মানবতার বুকে নিষ্ঠুর আঘাত,
শত্রুর বর্বরতায় রক্তে ভিজে বাংলার মৃত্তিকা।
কেঁপে ওঠে সমস্ত বাংলা, সম্বিত ফিরে পেলে,
প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে প্রতি জনে,
রক্ত-মাখা কান্না গর্জনে মাথা তোলে,
ধ্বংসস্তূপে নতুন স্বপ্নের বীজ বোনে।
সেই রাতের দুঃসহ স্মৃতি আজও মনে বাজে,
চোখে ভাসে ভয়ার্ত মুখ, পুড়ছে ঘর ও প্রাণ,
সত্যিকারের মুক্তির ডাক এরই মাঝে,
নির্ভীক যোদ্ধারা এলো নিয়ে মুক্তির আহ্বান।
প্রতিরোধের ঢাল হাতে যারা রুখে দাঁড়াল,
তাদের সাহস আজো দেয় আমাদের শক্তি,
আটকে রাখতে পারেনি শত্রুরা অগ্নিকণ্ঠ,
বাংলার শেষ লড়াইয়ে এল বিজয় এল মুক্তি।
কালরাত্রির গাঢ় আঁধার লুপ্ত হয়ে যায়,
সূর্যালোকে জেগে ওঠে স্বাধীনতার স্বাদ,
রক্তভেজা সে পথ মনে রাখি প্রতিক্ষণ,
প্রতিটি বিজয়ে একই সাথে বাজে আনন্দ-বিষাদ।
কবিতা ৩: বীর মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ
বীর মুক্তিযোদ্ধারা, তোমরা ছিলে পথের দিশা,
যেখানে ভয়াবহ অন্ধকার, সেখানে জ্বালালে আলো,
লিখলে ইতিহাসে মাতৃভূমির স্বাধীনতার নাম,
আপন জীবন তুচ্ছ করে ধরলে সাহসের পালক।
বুলেটের ঝনঝনানি, গোলার বিকট আওয়াজ,
শঠ শত্রুর হিংস্রতা—কিছুতেই থামাতে পারেনি,
তোমাদের অটল ইচ্ছাশক্তি, মনোবল, আত্মদানের গল্প,
ইতিহাসে লেগে থাকল অনন্য কীর্তির রথ।
রাতের নিস্তবদ্ধতায় রক্তাক্ত ত্যাগে,
বজ্র লড়াইয়ের মন্ত্রে মাতৃভূমি হয় মুক্ত,
স্বজন হারানোর ব্যথা খোদিত বুকে থাক,
তবু স্বাধীনতার আনন্দে নেচে ওঠে মন।
তোমরা জাগিয়েছো আমাদের আত্মমর্যাদা,
জাতির অখণ্ডতা রক্ষা করেছো দৃঢ় হাতে,
আজো তোমাদের ত্যাগে দেশ মেলে তার ডানা,
এগিয়ে চলে কল্যাণে, সংস্কৃতির উজ্জীবনে।
প্রতিটি মুহূর্তে স্মরণ করি সেই মহামানবদের,
ত্যাগের ফল আজ কোটি প্রাণে শ্বাস নেয়,
স্বাধীনতার পরম আনন্দ ভরে ওঠে প্রান্তরে,
তোমাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় গৌরবের জয়গান।
নবীন-প্রবীণ মিলেমিশে রাখি সেই অনুপ্রেরণা,
জাতির স্বপ্নপুরণ আজো তোমাদের পাওনা,
সুর্যস্তব্ধ বুকে প্রতিজ্ঞা করি—তোমরা অমর,
একাত্তরের সে বিজয়গাথা বাঙালির গর্বনামা।
কবিতা ৪: স্বাধীনতার আলোয় নবতর প্রদীপ
লাল-সবুজের খামে বেঁধে এলো নতুন ভোর,
সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হলো নবজাত স্বাধীনতা,
ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে উঠল অটল আশ্বাস,
সাফল্যের সিঁড়িতে পা দিয়ে হলো নতুন শুরু।
টিকেনি শত্রুর দম্ভ, অস্তমিত হলো জুলুম,
প্রাণের উচ্ছ্বাসে গেয়ে উঠি বিজয়ের জয়ধ্বনি,
রক্তস্নাত ঐতিহাসিক দিনগুলো সাক্ষী রইল,
আমরা অগ্নিমন্ত্রে নির্মাণ করি সমৃদ্ধির নগর।
কৃষিক্ষেত, কলকারখানা, সাহিত্য আর সঙ্গীতে,
চেতনার মশাল নিয়ে এগিয়ে যায় এ জনতা,
নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ঝলমল এই দেশ,
বিশ্বের মানচিত্রে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়াই।
মুক্তির সহস্র কবিতা জাগ্রত রাখে মননে,
ত্যাগ আর সাহসের শিক্ষায় গড়ি আমরা আগামীর পথ,
স্বাধীনতা শুধু আলোর মুখ দেখানো প্রতীকের নাম নয়,
ঐক্য আর মানবতার বাঁধনে আমরা অটুট থাকি।
ফাগুনের উদ্যমে, বৈশাখের ঝড়ে কেটে যাক ভয়,
উন্নয়নের কান্না ভাসিয়ে তুলি অমিত সম্ভাবনায়,
পৃথিবীর বুকে উড্ডীন হোক বাংলার স্বপ্ন-ডানা,
সাহসী চিত্তে বয়ে যাক স্বাধীনতার অমলিন জোয়ার।
কবিতা ৫: আগামীর প্রহরী
আগামী প্রজন্ম, তাকাও অতীতের পাতায়,
দেখো, কী ত্যাগ-তিতিক্ষায় পাওয়া লাল-সবুজের পতাকা,
ইতিহাসের ভাষায় ফুটে আছে বীরত্বের প্রতিচ্ছবি,
রক্তের সিঁড়ি বেয়ে এসেছিল বিজয়ের দিশা।
তোমাদের হাত ধরে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ,
উন্নয়নের পথচলায় প্রস্তুত করো মন,
শিক্ষা, সততা আর উদার মানসিকতায়,
জাতিকে দাও একটি পূর্ণাঙ্গ, সুন্দর পরিণতি।
সামাজিক বন্ধন, মানবিক মূল্যবোধ,
এ দেশকে করো স্নেহ আর ভালোবাসায় আলিঙ্গন,
ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যের ডালি সাজাও,
শান্তি আর প্রগতির ধ্বনি তুলো প্রতিটা ঘরে।
গণতন্ত্রের আলোর মধ্যে লালন করো ন্যায়,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে থাকুক সজাগ চেতনা,
মুক্তির পতাকা ভাসুক প্রতিটি হৃদয়ে,
অমিত সম্ভাবনায় উড়ুক স্বপ্নের রঙিন ডানা।
এই সুজলা-সুফলা জমিনে দাও কর্মের দ্যুতি,
বিজয়ে ধার মিশে থাকুক অবিরাম উদ্যমে,
জন্মভূমির মঙ্গল কামনায় রেখো অন্তর নত,
ইতিহাসের পরম্পরা হয়ে উঠুক আলোর প্রহরী তোমরা।
দেখুন- বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আবৃত্তির জন্য ৩টি বিদায়ী কবিতা
[…] স্বাধীনতা দিবস নিয়ে ৫টি নতুন কবিতা […]
[…] সম্পূর্ণ কবিতাটি পড়ুন এখানে […]