প্রিয় পাঠক, শুভেচ্ছা নিন। এই লেখায় আমরা জানবো যৌতুক প্রথার ইতিহাস। অনুচ্ছেদ রচনা, যৌতুক প্রথা প্রতিরোধের উপায়, যৌতুক প্রথা প্রতিবেদন, যৌতুক প্রথা অনুচ্ছেদ, যৌতুক প্রথার কুফল, যৌতুকের কারণ ও প্রতিকার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত। উপস্থাপন করছি আমি ময়নুল ইসলাম শাহ্‌

ভূমিকা
যৌতুক প্রথা বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে একটি পুরনো সামাজিক প্রথা, যা ইতিহাসের বিভিন্ন দিক দিয়ে সম্পর্কিত। যুগে যুগে এই প্রথা সমাজে একটি বিশেষ মর্যাদার চিহ্ন হিসেবে পরিগণিত হলেও, বর্তমানে এটি একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। নারীর মর্যাদা, আত্মসম্মান ও অধিকার নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি করা এই প্রথার কারণে সমাজের প্রতি একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে। তাই, যৌতুক প্রথা সম্পর্কে আমাদের আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে এবং এর কুফল থেকে মুক্তি পেতে সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

যৌতুক প্রথার ইতিহাস
এই প্রথার ইতিহাস অত্যন্ত পুরনো তবে এটি প্রাচীন ভারতীয় সমাজের অন্যতম একটি অন্ধবিশ্বাস থেকে উদ্ভূত হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে যৌতুক প্রথার প্রচলন মূলত ব্রাহ্মণ ও মুসলিম সমাজে ছিল। প্রথম দিকে, ইসলামী শাস্ত্র অনুযায়ী, মেহর বা উপহার প্রদানের প্রথা ছিল, যা স্বামীর কাছে স্ত্রীর অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ছিল। মেহর একটি ধর্মীয় অনুশাসন হলেও, এটি ছিল স্ত্রীর অধিকার ও সম্মানের প্রতীক। তবে, সমাজের একটি অংশের মধ্যে মেহরের পরিবর্তে যৌতুক প্রথার বিকৃতি ঘটতে শুরু করে।

ব্রিটিশ শাসনামলে, ভারতীয় সমাজের মধ্যে শ্রেণিভেদ ও ধনী-দরিদ্রের মধ্যে গভীর পার্থক্য ছিল। ধনী পরিবারগুলো মেয়ের বিয়েতে প্রচুর যৌতুক দাবি করতে শুরু করে, যা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য অত্যন্ত চাপের সৃষ্টি করেছিল। ব্রিটিশ শাসনকালে, যদিও কিছু আইন প্রণীত হয়েছিল, তবুও সমাজের মধ্যে যৌতুক প্রথা পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর, পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) যৌতুক প্রথার ব্যাপকতা বাড়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পূর্বে, দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক অমিলের কারণে, যৌতুক প্রথা এক ধরনের সামাজিক চাপের মতো চাপিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে মেয়েদের পরিবারকে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হতে হতো।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পরেও, যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে তেমন কোনো কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইন প্রণীত হওয়া সত্ত্বেও, এর বাস্তবায়ন তেমনভাবে সফল হয়নি। পরবর্তীতে কিছু আইনগত ও সামাজিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে যৌতুক প্রথা প্রতিরোধে সাফল্য এসেছে, তবে সমাজের কিছু অংশে এটি এখনও প্রচলিত রয়েছে।

যৌতুক প্রথার কারণ
যৌতুক প্রথার বেশ কিছু সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কারণ রয়েছে, যা বাংলাদেশের সমাজে এই প্রথাকে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

১. পারিবারিক মর্যাদা: অনেক পরিবার যৌতুককে সামাজিক মর্যাদার একটি চিহ্ন হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। একটি “ভালো” বিয়ের জন্য ঐতিহ্যবাহী ও মূল্যবান উপহার দেওয়া বা গ্রহণ করা পরিবারের অবস্থান ও ক্ষমতা প্রদর্শন করার একটি উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

  1. অর্থনৈতিক লোভ: কিছু ক্ষেত্রে, যৌতুকের মাধ্যমে পাত্র বা পাত্রীর পরিবার আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে এটি দাবি করে। তাদের জন্য এটি এক ধরনের আয় এবং সামান্য সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার একটি পথ।
  2. সামাজিক চাপ: পারিবারিক এবং সামাজিক পরিবেশে যৌতুক প্রথা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার কারণে, এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া অনেক পরিবার এবং ব্যক্তির জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের সন্তানদের বিয়েতে যৌতুক না দিলে তারা সামাজিকভাবে হেয় হতে পারে বলে ভয়ের মধ্যে থাকে।
  3. অশিক্ষা ও অজ্ঞতা: অনেক ক্ষেত্রে, যৌতুক প্রথা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বিদ্যমান থাকে। যেহেতু অনেক পরিবার এখনও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত, তাই তাদের জন্য যৌতুক একটি অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

যৌতুক প্রথার কুফল
যৌতুক প্রথার বেশ কিছু কুফল রয়েছে, যা আমাদের সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

১. নারীর শোষণ ও নির্যাতন: যৌতুক না দেওয়ায় বা তার পরিমাণ কম হওয়ায় নারীরা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হন। অনেক নারী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য হন এবং কিছু ক্ষেত্রে, তাদের জীবনও শেষ হয়ে যায়।

২. পারিবারিক অশান্তি: যৌতুকের কারণে বিয়ের পরপরই পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি হয়। নারীর পরিবার, বিশেষ করে তার পিতা-মাতা, যৌতুকের অস্থিরতা এবং শঙ্কার মধ্যে থাকেন, যা তাদের জীবনের শান্তি কেড়ে নেয়।

৩. অর্থনৈতিক চাপ: মেয়ের পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব করতে যৌতুক প্রথা চাপিয়ে দেওয়া হয়। এ কারণে, অনেক পরিবার নিজেদের জীবনযাত্রা কঠিন করে তোলে এবং নিজেদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।

যৌতুক নিরোধ আইন ও এর গুরুত্বপূর্ণ ধারা
বাংলাদেশে যৌতুক নিরোধের জন্য ১৯৮০ সালে যৌতুক নিরোধ আইন প্রণীত হয়। এই আইনের উদ্দেশ্য হলো, যৌতুকের প্রথা বন্ধ করা এবং এর শিকার নারীদের সুরক্ষা প্রদান করা। যৌতুক নিরোধ আইনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা নিচে উল্লেখ করা হলো:

১. ধারা ৩: কোনো ব্যক্তি বিয়ে বা পারিবারিক সম্পর্কের সময় যৌতুক দাবি করলে তাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।
২. ধারা ৪: যদি কোনো ব্যক্তি যৌতুকের কারণে পণ্য বা অর্থ গ্রহণ করেন, তবে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে, যার মধ্যে কারাদণ্ড এবং জরিমানা অন্তর্ভুক্ত।
৩. ধারা ৫: যদি যৌতুকের কারণে কোনো নারী আত্মহত্যা বা গুরুতর শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেন, তবে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

যৌতুক নেয়ার শাস্তি বা দণ্ড
যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে যৌতুক নিরোধ আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি বিয়েতে যৌতুক দাবি করে বা গ্রহণ করে, তবে তাকে ১ বছরের কারাদণ্ড বা ২০,০০০ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া হতে পারে। এর পাশাপাশি, যদি কোনো নারী যৌতুকের কারণে শারীরিক নির্যাতন বা আত্মহত্যার শিকার হন, তবে তা আরও গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপসংহার
যৌতুক প্রথা বাংলাদেশের একটি পুরনো, কিন্তু অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রথা। এটি সামাজিকভাবে নারীর মর্যাদা ও অধিকার ক্ষুন্ন করে এবং পরিবারগুলোকে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে নিঃস্ব করে দেয়। যদিও যৌতুক নিরোধের জন্য আইন রয়েছে, তবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সমাজের শিক্ষা, সচেতনতা এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা যৌতুক প্রথা নির্মূল করতে পারি।

আরও পড়ুন- শব্দ দূষণ বিধিমালায় শব্দ দূষণ ও তার প্রতিকার

Close-up of a woman in traditional dress with intricate gold jewelry.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *